ভারতের জলবায়ু
অনেক পণ্ডিতই ভারতের জলবায়ু অঞ্চলের বিভাজনের প্রয়াস করেছেন। এদের মধ্যে Trevartha-র জলবায়ু বিভাজনই অত্যধিক প্রচলিত। এই প্রচলিত ভাগ অনুযায়ী ভারতকে নিম্নলিখিত জলবায়ু প্রদেশে বিভক্ত করা যায়।
ট্রিওয়ারথা (Trewartha)-র জলবায়ু বিভাজন হলো বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর শ্রেণিবিন্যাসের একটি আধুনিক পদ্ধতি, যা কোপেন (Köppen) পদ্ধতির সংশোধিত রূপ। এটি মানবজীবন ও উদ্ভিদের বৃদ্ধির সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে জলবায়ুকে শ্রেণি ভাগ করেছে।
ভারতে ট্রিওয়ারথার বিভাজন অনুযায়ী জলবায়ু প্রধানত নিম্নলিখিত ভাগে বিভক্ত:
১. আর্দ্র উপক্রান্তীয় জলবায়ু (Humid Subtropical)
- অবস্থান: উত্তর ভারত (পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, পশ্চিমবঙ্গের সমভূমি)।
- বৈশিষ্ট্য:
- গ্রীষ্মে গরম, শীতে শীতল।
- বৃষ্টিপাত প্রধানত বর্ষাকালে।
২. উষ্ণ মৌসুমি জলবায়ু (Tropical Monsoon)
- অবস্থান: গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ডেল্টা, পূর্ব উপকূলীয় সমভূমি।
- বৈশিষ্ট্য:
- বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টিপাত।
- গরম গ্রীষ্ম, মৃদু শীত।
৩. উষ্ণ শুষ্ক জলবায়ু (Tropical Semi-Arid & Arid)
- অবস্থান: রাজস্থান, গুজরাট, পাঞ্জাবের কিছু অংশ।
- বৈশিষ্ট্য:
- খুব কম বৃষ্টিপাত (১০–৫০ সেমি)।
- দিনে প্রচণ্ড গরম, রাতে ঠান্ডা।
৪. উষ্ণ সাভানা জলবায়ু (Tropical Savanna)
- অবস্থান: মধ্য ভারত, দাক্ষিণাত্য মালভূমি (মহারাষ্ট্র, ছত্তিশগড়, তেলেঙ্গানা)।
- বৈশিষ্ট্য:
- গ্রীষ্মে গরম ও শুষ্ক, বর্ষায় বৃষ্টি।
- ঘাসভূমি ও পত্রঝরা বন।
৫. পর্বতীয় জলবায়ু (Mountain Climate)
- অবস্থান: হিমালয় অঞ্চল।
- বৈশিষ্ট্য:
- উচ্চতার সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তন।
- তুষারাবৃত শিখর, শীতল আবহাওয়া।
৬. উষ্ণ উপকূলীয় আর্দ্র জলবায়ু
- অবস্থান: পশ্চিমঘাট, মালাবার উপকূল, আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ।
- বৈশিষ্ট্য:
- সারা বছর আর্দ্রতা।
- প্রবল বর্ষা (বিশেষত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু থেকে)।
ভারতের জলবায়ু বিশ্বে একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জলবায়ু ব্যবস্থা, যা মূলত মৌসুমি জলবায়ু (Monsoon Climate) নামে পরিচিত। ভারতীয় জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে ভৌগোলিক অবস্থান, অক্ষাংশ, সমুদ্রের সান্নিধ্য, হিমালয়ের প্রাচীর, মৌসুমি বায়ু ইত্যাদি।
ভারতের জলবায়ুর প্রধান বৈশিষ্ট্য
- মৌসুমি প্রকৃতি:
- গ্রীষ্মকালে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়।
- শীতকালে উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু প্রবাহিত হয়।
- বৈচিত্র্যপূর্ণ জলবায়ু:
- রাজস্থানে শুষ্ক গরম জলবায়ু।
- চেরাপুঞ্জি ও মাওসিনরামে অতিবর্ষণ।
- হিমালয়ে শীতল জলবায়ু।
- বর্ষণ নির্ভরশীল কৃষি:
- বৃষ্টির ৭০–৯০% মৌসুমি বায়ুর ওপর নির্ভরশীল।
- তাপমাত্রার চরম পার্থক্য:
- গ্রীষ্মে থর মরুভূমিতে তাপমাত্রা ৫০°C পর্যন্ত।
- শীতে হিমালয়ে -৪০°C পর্যন্ত।
ভারতের জলবায়ুর কারণ
- অক্ষাংশ: কর্কটক্রান্তি রেখা ভারতের মধ্য দিয়ে গেছে।
- ভূপ্রকৃতি: হিমালয় শীতল বায়ুকে বাধা দেয়।
- সমুদ্রের সান্নিধ্য: উপকূলীয় অঞ্চল সমুদ্রীয় জলবায়ু পায়।
- মৌসুমি বায়ু: দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু ভারতের বৃষ্টিপাত নির্ধারণ করে।
ভারতের জলবায়ুর প্রধান ঋতু
ভারতের জলবায়ু প্রধানত ৬টি ঋতুতে ভাগ করা যায় (ভারতীয় ঋতুচক্র অনুযায়ী):
| ঋতু | সময়কাল | বৈশিষ্ট্য |
| শীতকাল | ডিসেম্বর–ফেব্রুয়ারি | শীতল ও শুষ্ক বায়ু প্রবাহ, হালকা বৃষ্টি (পশ্চিমী ঝড়) |
| গ্রীষ্মকাল | মার্চ–মে | উচ্চ তাপমাত্রা, লু প্রবাহ |
| বর্ষাকাল (দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী) | জুন–সেপ্টেম্বর | প্রধান বৃষ্টির সময় |
| বর্ষোত্তর বা শরৎকাল | অক্টোবর–নভেম্বর | উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু, তামিলনাড়ুতে বৃষ্টি |
| বসন্তকাল | ফেব্রুয়ারি–মার্চ | মনোরম আবহাওয়া |
| হেমন্তকাল | অক্টোবর–নভেম্বর | শীতের আগমনী কাল |
ভারতে বৃষ্টিপাতের ধরন
- দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বৃষ্টি: ভারতের প্রধান বৃষ্টি (৮০%)।
- উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বৃষ্টি: তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশে।
- স্থানীয় বৃষ্টি: কালবৈশাখী (পশ্চিমবঙ্গ), চেরাপুঞ্জি (ভারতের সর্বাধিক বৃষ্টি)।




