বেদ
- ‘বেদ’ শব্দের উৎপত্তি বিদ্ধাতু থেকে, যার অর্থ ‘জানা’।
- বেদকে বলা হয় অপৌরুষেয় বা নিত্য।
- বেদ সংকলক ঋষিদের বলা হয় মন্ত্রদ্রষ্টা।
- প্রথম তিনটি বেদকে (ঋক, সাম ও যজুর) একত্রে ত্রয়ী বলা হয়।
- প্রতিটি বেদ সংহিতায় বিভক্ত।
ঋগ্বেদ
- মোট মন্ত্র 1028টি।
- 250টি মন্ত্র ইন্দ্রকে ও 200টি মন্ত্র অগ্নিকে উৎসর্গীকৃত।
- ঋগ্বেদ 10টি মণ্ডলে বিভক্ত। দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডল প্রাচীনতম। প্রথম, অষ্টম, নবম ও দশম মণ্ডল পরবর্তী সংযোজন।
- দ্বিতীয় থেকে সপ্তম মণ্ডল পরিবার মণ্ডল নামে পরিচিত।
- বিশ্বামিত্র রচিত তৃতীয় মণ্ডলে বিখ্যাত গায়ত্রী মন্ত্র সংকলিত।
- নবম মণ্ডল পুরোপুরি সোমদেবকে উৎসর্গীকৃত।
- দশম মণ্ডলে পুরুষসূক্ত মতবাদ সংকলিত।
- দশম মণ্ডলের দুটি মন্ত্রের বিষয় সম্পূর্ণভাবে অশ্ব।
- ঋগ্বেদে ‘ওম’ শব্দটি 1028 বার, ‘জন’ 275 বার, ‘অশ্ব’ 215 বার, ‘গো’ 176 বার, ‘ষাঁড়’ 170 বার, ‘বিধাতা’ 122 বার এবং ‘আর্য’ শব্দটি 36 বার উল্লিখিত হয়েছে।
সামবেদ
- বিষয়: গানের সংকলন।
- মোট মন্ত্র 1063টি (সর্বাধিক)।
- ভারতীয় সংগীতের প্রাথমিক পর্যায়।
- সামবেদের মন্ত্রগুলি সোম যজ্ঞের সময় গাওয়া হত।
- ধ্রুপদ রাগ এই বেদের বিষয়।
যজুর্বেদ
- বিষয়: যজ্ঞের নিয়মকানুন।
- যজুর্বেদে প্রথম ‘রাজসূয়’ ও ‘বাজপেয়’ যজ্ঞের উল্লেখ পাওয়া যায়।
- একমাত্র বেদ যা পদ্য ও গদ্য উভয় মাধ্যমে লিখিত।
- যজুর্বেদ দুই ভাগে বিভক্ত-1. কৃষ্ণ যজুর্বেদ: গদ্য ও পদ্য এবং 2. শুক্ল যজুর্বেদ: শুধু পদ্য।
অথর্ববেদ
- বিষয়: জাদুবিদ্যা ও সাধারণ মানুষের সমস্যাবলি।
- 20 টি কান্ডে বিভক্ত।
- মনে করা হয় এই বেদ অনার্যদের সৃষ্টি।
- মোট মন্ত্র সংখ্যা 731 টি।
উপনিষদ
- বৈদিক যুগের শেষ দিকে 500 খ্রীষ্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময়ে পাঞ্চাল এবং বিদেহ নামক জনপদে পুরোহিতদের দাপট এবং ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের জটিলতা বৃদ্ধির প্রতিবাদে জনমানসে ক্ষোভের সূচনা হয়। এই সময়ে উপনিষদগুলি রচিত হয়। উপনিষদগুলিতে রয়েছে দার্শনিক আলোচনা, সমালোচিত হয়েছে যাগযজ্ঞের আচার সর্বস্বতা, ব্যাখ্যা করা হয়েছে পরমাত্মা বা ব্রহ্মের সাথে আত্মার সম্পর্ক।
- উপনিষদগুলিতে বিবৃত হয়েছে গুরু এবং শিষ্যের কথোপকথন যেগুলি লিপিবদ্ধ করেছেন সম্ভবত ক্ষত্রিয়গণ। উপনিষদগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ বৃহদারণ্যক এবং ছান্দোন্য উপনিষদ। বৃহদারণ্যক পবিত্র চিহ্ন ‘ওম’ এর উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
- কথা উপনিষদে নচিকেতা এবং তিনি মৃত্যুর ভগবানের থেকে যে তিনটি উপহার পেয়েছিলেন তা নিয়ে বলা আছে। আরো বলা আছে জ্ঞানের থেকে বড় হল বিভিন্ন স্থাবর ও অস্থাবর পদার্থ, স্থাবর ও অস্থাবর পর্দাথের চেয়ে বড় হল “মন” মনের চেয়ে বড় হল “বুদ্ধি” বুদ্ধির চেয়ে বড় হল আত্মা।
- সবমিলিয়ে 108 টি উপনিষদ রয়েছে। 800 খ্রীঃপূর্বাব্দ থেকে 500 খ্রীঃপূর্বাব্দ উপনিষদের রচনাকাল বলে পরিগণিত হয়।
- 11টি উপনিষদকে মুখ্য উপনিষদ বলা হয়।
- উপনিষদগুলি আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক।
- উপনিষদগুলি বেদের লক্ষ্যকে ফুটিয়ে তোলে।
- উপনিষদগুলিকে “বেদান্ত ও বেদারীতা” বলা হয়। কারণ এগুলি বৈদিক যুগের শেষ পর্যায়কে সূচিত করে।
- সংহিতা দেবতার উদ্দেশ্যে মন্ত্র ও স্তোত্র পদ্যে লেখা আছে সংহিতা অংশে।
- উপনিষদ জ্ঞানের নীতি মেনে চলে যেমন-শান্তির সত্য জ্ঞান অর্জন এবং অপরিবর্তিত, অক্ষুণ্ণ ও অমরত্ব আত্মার।
- “সত্যমেব জয়তে” কথাটি মুন্ডক উপনিষদ থেকে নেওয়া হয়েছে।
| মুখ্য উপনিষদ | বেদ |
| আত্রেয় | ঋক্ বেদ |
| বৃহদারণ্যক | শুক্ল যজুর্বেদ |
| ইষা | শুক্ল যজুর্বেদ |
| চন্দ্র গন্ধা | সাম্ বেদ |
| কথা | কৃষ্ণ যজুর্বেদ |
| ততেরিয়া | কৃষ্ণ যজুর্বেদ |
| ভেতাস্তারা উপনিষদ | কৃষ্ণ যজুর্বেদ |
| কেন | সাম্ বেদ |
| মান্ডুক্য/মুন্ডাকা/প্রশ্ন | অথর্ব বেদ |
ব্রাহ্মণ
- মোট সংখ্যা 18 টি
- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ – শতপথ ব্রাহ্মণ
- প্রতিটি বেদের চারটি ভাগের একটি হল ব্রাহ্মণ। এটিতে যাগযজ্ঞের বিধি ব্যবস্থা গদ্যে লেখা আছে।
- ঋগবেদের দুটি ব্রাহ্মণ আছে 1. আত্রেয় 2. কৌশীটাকী অথবা সংখ্যায়ন।
- কখনও কখনও ব্রাহ্মণের বিষয়বস্তু সংহিতার বিষয়বস্তুর সঙ্গে যুক্ত থাকে। যদিও বেশীরভাগ বিষয়বস্তু পুরোপুরি সংহিতার বিষয় থেকে আলাদা প্রত্যেক বৈদিক শাখা একটি নিজস্ব ব্রাহ্মণ আছে।
- সবচেয়ে পুরাতন ব্রাহ্মণ 900 খ্রীস্টপূর্বাব্দে রচিত হয়েছিল ও সবচেয়ে নবীন বাহ্মণ 700 খ্রীঃপূর্বাব্দে রচিত হয়েছিল।
আরণ্যক
- আরণ্যকের আরেক নাম “বন গ্রন্থ” (Forest Books)। কারণ এগুলি বনে অরণ্যে রচিত হয়েছিল।
- আরণ্যকগুলি অরণ্যে পাঠ করার জন্য রচিত হয়েছিল।
- আরণ্যকে সন্ন্যাসীদের অরণ্যে জীবনযাপন নিয়ে বর্ণনা আছে।
- এগুলি অরণ্যে বসবাসকারী সাধুরা আবৃত্তি করে পড়তেন।
- আরণ্যকের আরেক নাম ছিল কর্ম কান্ড।
- প্রধাণত দু ধরনের আরণ্যক আছে
- আত্রেয় আরণ্যক – ঋক্ বেদের আত্রেয় শাখার সঙ্গে যুক্ত আত্রেয় আরণ্যকে পাঁচটি অধ্যায় আছে।
- তৈত্রেয় আরণ্যকে – দশটি অধ্যায় আছে। কৃষ্ণ যজুর্বেদের তৃতীয় 2 শাখার সঙ্গে যুক্ত তৈত্রেয় আরণ্যক।
বেদাঙ্গ
- সূত্র সাহিত্যের একটি ভাগ হল বেদাঙ্গ, এগুলি বিজ্ঞান ও কলাবিভাগ নিয়ে আলোচনা করেছে। বেদাঙ্গ 6 ভাগে বিভক্ত-
1. শিক্ষা (বিশুদ্ধ উচ্চারণ)
2. ছন্দ (বেদের ছন্দ সম্বন্ধে জ্ঞান)
3. ব্যাকরণ (ভাষা ব্যবহারের নিয়ম)
4. নিরুক্ত (শব্দের উৎপত্তির ব্যাখ্যা)
5. জ্যোতিষ (গ্রহ নক্ষত্রাদি সম্বন্ধে জ্ঞান)
6. কল্প (যাগযজ্ঞের বিধান)
- “অষ্টাধায়ী” (4 খ্রীঃ পূর্বাব্দ) লিখেছিলেন পানিনি ব্যাকরণের উপর।
উপবেদ
- উপবেদকে “সহায়ক” বেদ বলা হয়।
- এই বেদে রয়েছে ঔষধ, স্থাপত্যকলা, যৌনতা, ধনুর্বিদ্যা এবং বিভিন্ন শিল্পকলা এবং কারুশিল্প। এর কিছু অংশ আসল বেদের থেকে নেওয়া হয়েছে।
- চারটি উপবেদ আছে
1. ধনুর্বেদ (যজুর্বেদ এর উপবেদ) যুদ্ধের কৌশল নিয়ে বর্ণনা আছে, বিশেষত: ধনুর্বিদ্যা
2. গান্ধর্ববেদ (সামবেদ এর উপবেদ) কলাশাস্ত্র এবং সঙ্গীতশাস্ত্র নিয়ে আলোচনা আছে।
3. স্থাপত্যবেদ (অথর্ববেদের উপবেদ) বৈদিক যুগের স্থাপত্য, ভাস্কর্য নিয়ে আলোচনা করা আছে।
4. আয়ুর্বেদ (ঋকবেদ এর উপবেদ) ঔষধবিদ্যা নিয়ে আলোচনা আছে।
পুরাণ
- পুরাণে রয়েছে পৌরাণিক তত্ত্ব, সৃষ্টিতত্ত্ব, বিভিন্ন কিংবদন্তী, লোক বিশ্বাস, আইনের কোড এবং বিবিধ বিষয়।
- পূজা করার পদ্ধতি পাল্টানোর ধারণা উত্থাপিত করেছিলেন (বলিদানের থেকে মূর্তি পূজা)। ধারণার উপাসনা থেকে দৃশ্যমান দেবদেবীদের উপাসনা করা।
- প্রাচীন কিংবদন্তীর বিবরণে পুরাণ খুবই কুসংস্কারাছন্ন ছিল।
18টি পুরাণ
1. ব্রহ্ম
2. বিষ্ণু
3. শিব
4. পদ্ম
5. শ্রীমদ ভগবত
6. অগ্নি
7. নারদ
8. মর্কন্দ
9. ভবিষ্য
10. লিঙ্গ
11. বরাহ
12. বামন-২
13. ব্রাহ্ম বৈত্রেয়
14. শব্দ
15. সূর্য
16. মৎস্য
17. গরুড়
18. ব্রহ্মান্ড
সূত্র
• 500 খ্রীস্টপূর্বাব্দে বেদ সংস্কৃতের শেষ নিদর্শন পাওয়া গেছে। এই সময়ে শ্রাউন্ত সূত্র (যারা বড় আকারের বলিদানের সাথে যুক্ত), গৃহ সূত্র (যারা জন্ম, নামকরণ এবং বিবাহের বিভিন্ন পদ্ধতির সাথে যুক্ত) এবং ধর্ম সূত্র (যারা সামাজিক এবং স্থানীয় প্রথার সাথে যুক্ত) রচিত হয়েছে।
তন্ত্র
• শক্তি বা শিবায়িত শ্রেণীদের বা বৌদ্ধ পণ্ডিতদের লিখিত লিপিগুলিকে তন্ত্র বলে।
আগম
• সাম্প্রদায়িক হিন্দু যেমন শাক্ত, শিবায়িত বা বৈষ্ণবদের ধর্মগ্রন্থকে আগম বলে।
উপাঙ্গ
• উপাঙ্গ হচ্ছে একটি জাতীয় নাম দেওয়া হয়েছে চুক্তির সংগ্রহ সমূহকে যেটা ঐতিহ্যগত ভাবে সীমাবদ্ধ হয়েছিলো ন্যায় এবং মীমাংসার দার্শনিক প্রথায়-যেমন ধর্মসূত্র, পৌরাণ এবং তন্ত্র।
মহাকাব্য
- রামায়ণ-মহাকাব্য রামায়ণ রচনা করেছিলেন ঋষি বাল্মীকি, মহাভারত মহাকাব্যর থেকে দেড়শো বছর আগে ঘটেছিলো, রামায়ণ গল্পের আদি উৎস যেটা প্রাকৃত ভাষায় বৃত্তমান ছিলো, যেটা এক থেকে বেশীভাষায় তার অনুবাদ করা হয়েছিলো। এটি অবার সংস্কৃত ভাষায় পুণর্বার লেখা হয় এবং উদ্দীপ্ত হয় প্রচুর শ্লোক দ্বারা। এটাকে আদি কাব্য নামে জানা যায়। রামায়ণের সব থেকে পুরনো জায়গায় প্রমাণ পাওয়া যায় 350 স্ত্রী পূর্বাব্দ।
- মহাভারত (বেদ ব্যাস)-মহাভারত সবথেকে বৃহৎ মহাকাব্য যেটায় 100000 শ্লোক রয়েছে এবং যেটি 18 টা পর্বে ভাগ করা হয়েছিলো। এই কাব্যটি রচয়িতা হলেন ঋষি বেদ ব্যাস, কিন্তু বিভিন্ন পণ্ডিতরা তাদের দ্বিমত প্রকাশ করেছেন যে এতো বড় কাজটা একা একটি লোকের পক্ষে করা সম্ভব না। এই গদ্যটি পদ্যর এক চর্তুথাংশ দখল করে রয়েছে। মহাভারত কাব্যর গল্প হলো আর্যদের যুদ্ধ নিয়ে-কৌরব এবং পাণ্ডবদের। আর বাকি গল্পটা দৈবাৎ যার মধ্যে রয়েছে সৃষ্টিতত্ব, যুদ্ধবিজ্ঞান, কাল্পনিক ইতিহাস, পৌরাণিকত্ত্ব এবং দার্শনিক দিক রয়েছে যেটা ভাগবদ্গীতা থেকে ভালো জানা যায়।
এক নজরে বৈদিক সভ্যতা
| ভারতীয় সঙ্গীতের উৎস | সাম বেদ |
| ভারতের পাঁচ ভাগ | আত্রেয় ব্রহ্ম |
| “শুদ্র” শব্দের উল্লেখ করা হয়েছে | ঋক্কেদের দশম মণ্ডলে |
| স্বামী স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক | শতপথ ব্রাহ্মণ |
| গায়ত্রী মন্ত্র | ঋব্দে (তৃতীয় মণ্ডল-সাবিত্রী-আলোর দেবীকে উৎসর্গ করা হয়েছিলো) |
| দশটা রাজার যুদ্ধ | ঋক্কেদ (সপ্তম মণ্ডল) |
| ‘যজ্ঞ’ কথাটির উল্লেখ | ব্রাহ্মণ |
| ব্রাহ্মণদের উচ্চস্থান | আত্রেয় ব্রহ্ম |
| বর্ণ | ঋক্ বেদ |
| সত্যমেব জয়তে | মুণ্ডক উপনিষদ |
| পশুপতি শিব | অথর্ব বেদ |
| বিষ্ণু | শতপথ ব্রাহ্মণ |
| চারটে আশ্রমের উল্লেখ | জবলা উপনিষদ |
| সোম (পানীয়) | ঋবেদ (নবম মণ্ডল) |
| রাজন্যায় | ঋকবেদ (দশম মণ্ডল) |
| “মারুত” কৃষিবিদ রূপে | শতপথ ব্রাহ্মণ |
| সমাজের চারটে ভাঁজ বিভাগ | ঋক্কেদ (দশম মণ্ডল) |
| আর্য এবং দাসদের মধ্যে যুদ্ধ | ঋব্দে |
| আত্মার পূর্ণজন্ম | বৃহদাণ্যক উপনিষদ |
| যম এবং নচিকেতার মধ্যে রূপান্তর | কথা উপনিষদ |




