সিন্ধু সভ্যতা / হরপ্পা সভ্যতা

  1. সিন্ধু নদ ও তার উপনদগুলির উভয় তীরে খ্রিস্টপূর্ব 3000 অব্দে তাম্র ব্রোঞ্জ যুগের নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, তাই সিন্ধু সভ্যতা নামে পরিচিত।
  2. সিন্ধু সভ্যতাতে প্রথম আবিষ্কৃত স্থানের নাম হরপ্পা, তাই সিন্ধু সভ্যতাকে হরপ্পা সভ্যতাও বলা হয়ে থাকে।
  3. আবার হরপ্পা সভ্যতাকে অনেকের সিন্ধু সরস্বতী সভ্যতা বলেও বর্ণনা করে থাকেন।

আবিষ্কারক: বিখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক স্যার জন মার্শালের নেতৃত্বে হাজার 1921 সালে দয়ারাম সাহানি প্রথম হরপ্পা সভ্যতার আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে 1922 সালে রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহেঞ্জোদারো আবিষ্কার করেন।

Note: স্যার জন মার্শাল ছিলেন তৎকালীন সময়ে ASI (Archaeological Survey of India)- এর অধিকর্তা। ASI এর প্রথম অধিকর্তা ছিলেন আলেকজান্ডার ক্যানিংহাম।

সভ্যতার সময়কাল:- হরপ্পা সভ্যতাকে মূলত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। যথা-

  1. প্রাক হরপ্পা- 3200-2600 BC
  2. পরিপূর্ণ হরপ্পা- 2600-1900 BC
  3. উত্তর হরপ্পা- 1900-1300 BC

তবে হরপ্পা সভ্যতার সময়কাল বললে আমরা মূলত 2300 থেকে 1750 খ্রিষ্টপূর্বাব্দকেই বুঝি।

ব্যপ্তি :- প্রায় 1550 কিমি পরিধি সহকারে বিস্তৃত ছিল এই সভ্যতা। উত্তরে মান্ডা (জম্বু কাশ্মীর) দক্ষিনে মালভান (মহারাষ্ট্র) পূর্বে আলমগীর পুর (উত্তর প্রদেশ) পশ্চিমে সুতাকাজেন্ডোর (বালুচিস্থান) পর্যন্ত এই সভ্যতা বিস্তৃত ছিল। পূর্ব থেকে পশ্চিমে 1100 কিমি এবং উত্তর থেকে দক্ষিনে 1600 কিমি পরিধি নিয়ে হরপ্পা সংস্কৃতির বিস্তৃত ছিল।

সিন্ধু সভ্যতার বিস্তৃতি:–

সিন্ধু সভ্যতার মূল কেন্দ্রগুলি বর্তমান পাকিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত। প্রধান দুই কেন্দ্র হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো বর্তমান পাকিস্তানের অন্তর্গত। প্রথম কৃষিজীবী গোষ্ঠীর সন্ধানও পাওয়া যায় পাকিস্তানে-বালুচিস্তানের বোলান গিরিখাদের কাছে মেহেরগড়ে। সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার সময়কালকে চারটি পর্বে ভাগ করা যায়।

  1. হরপ্পা আদি পর্যায়-মেহেরগড়।
  2. খড়গপুর পরিণত পর্যায়-আমরি
  3. হরপ্পার পরিণত পরবর্তী পর্যায়-কালিবঙ্গান
  4. হরপ্পার অন্তিম পর্যায়-লোথাল

উপরের কেন্দ্রগুলি ছাড়াও এই সভ্যতার অসংখ্য কেন্দ্র ভারত পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পাওয়া গেছে।

  • মাকরান উপকূলের নিকটবর্তী সুতকাজেন্দর- পশ্চিম সীমান্ত।
  • উত্তরপ্রদেশের আলমগীরপুর- পূর্ব সীমান্ত।
  • জম্মুর অন্তর্গত মান্ডা-উত্তর সীমান্ত।
  • মহারাষ্ট্রের দায়মাবাদ-দক্ষিণ সীমান্ত।

নগর পরিকল্পনা এবং গঠন :-

  • নগরগুলি দুটি খণ্ডে বিভক্ত থাকতো, যথা-উপরের অংশ বা সিটাডেল বা নগর দুর্গ এবং নিম্ন অংশ।
  • সিটাডেলগুলি নগরের পশ্চিমাংশে ছিল। তৎসহ সেখানকার অট্টালিকাসমূহে শাসক শ্রেণীর লোকেরা বসবাস করত।
  • অন্যদিকে সিটাডেলের নিম্নাংশে অর্থাৎ নগরের পূর্ব প্রান্তের অট্টালিকা সমূহে সাধারণ শ্রেণীর লোকেরা বসবাস করত।
  • নগরগুলি অধিকমাত্রায় পোড়া ইটের অট্টালিকা প্রাপ্ত হলেও সম্পূর্ণরূপে পাথর নির্মিত অট্টালিকা অনুপস্থিত ছিল।
  • ভূগর্ভস্থ পয়ঃপ্রণালী ব্যবস্থায় নগরের সমস্ত অট্টালিকা সমূহের নালাগুলি বড়ো রাস্তার নর্দমায় পতিত হত। নর্দমাগুলিকে ইট বা পাথরের ঢাকনা দ্বারা চাপা দেওয়া থাকত। তৎসহ সজ্জিত ম্যানহোল ব্যবস্থার উপস্থিতি লক্ষণীয় ছিল। নর্দমাগুলিতে চুন দেওয়া হত। তাই বলা যায় সিন্ধু বাসিরা ছিল স্বাস্থ্যসচেতন।

বৃহৎ স্নানাগার (মহেঞ্জোদাড়ো):- এই স্নানাগারটি ধর্মীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হত। স্নানাগারটির উভয় প্রান্ত থেকে সিঁড়ির ধাপ তলদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তৎসহ স্নানাগারটির মধ্যে জল ভরার জন্য নল এবং জল নিষ্কাশন এর জন্য পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা ছিল।

বৃহৎ শস্যাগার (হরপ্পা):- হরপ্পার সিটাডেল বা নগর দুর্গগুলি সংলগ্ন সারিবদ্ধ ছয়টি শস্যাগার ছিল।

সামাজিক জীবন :-

  • কার্যের উপর ভিত্তি করে সমাজ শ্রেণীবিভক্ত ছিল। শ্রেণীবিভক্ত সমাজ এই হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
  • জাতিভেদ প্রথা কিংবা বর্ণ প্রথার প্রচলন ছিল না।
  • পন্ডিতরা অনুমান করেন এই শহরে ক্রীতদাস ছিল। তারা মূলত শহরের জঞ্জাল পরিষ্কার, ভারী বোঝা বহন প্রভৃতি কাজগুলো করে থাকতো।
  • হরপ্পা সভ্যতার অধিবাসীদের ফলমূল, তিল, খেজুর, গম, বার্লি, যব, ভাত, শাকসবজি, মুরগি, ভেড়া, গরু, বিভিন্ন পশু-পাখির মাংস, দুধ খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করতো। এছাড়া মাছ শিকারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
  • পোশাক হিসেবে পশম এবং সুতিবস্ত্র উভয়ই ব্যবহার করত। দুই খন্ড পোশাক দ্বারা শরীর আচ্ছাদিত থাকতো। উপরের অংশের বস্ত্রকে বলা হতো নিবি এবং নিম্নাঙ্গের কাকে বলা হত পরিধান।
  • ছেলে ও মেয়ে উভয়েই অলংকার ব্যবহার করত। মেয়েরা সোনা ও রুপোর ফিতে দিয়ে নানা ধরনের খোপা করতো। এছাড়া নানা ধরনের প্রসাধনী সামগ্রী, সুগন্ধি এমনকি সুরমার ব্যবহারও তারা জানতো।
  • গৃহপালিত জন্তুর মধ্যে গরু, মোষ, ভেড়া, ছাগল, উট ছিল উল্লেখযোগ্য।
  • তাম্র প্রস্তর যুগের এই মানুষেরা তামা, ব্রোঞ্চ ও পাথরের তৈরি কুঠার, তির-ধনুক, বর্শা প্রভৃতি অস্ত্র ব্যবহার করত। তবে আত্মরক্ষামূলক কোন অস্ত্র যেমন-ঢাল, শিরস্ত্রানের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
  • হরপ্পা সভ্যতার মানুষদের অবসরে বিনোদনের মূল উপায় ছিল পাশা খেলা, রথচালনা, ষাঁড়ের লড়াই, শিকার, নৃত্যগীতি প্রভৃতি। জুয়া খেলা ছিল খুব জনপ্রিয়।
  • হরপ্পা সভ্যতার মানুষদের দাহ করা এবং কবর দেওয়া উভয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
  • কুমোরের চাকার সাহায্যে বিভিন্ন মৃৎপাত্র তৈরি করা হতো এইসময়। এগুলো ছিল মূলত উজ্জ্বল বা কালচে লাল রঙের। খুব ভালোভাবে পুড়িয়ে এর গায়ে বিভিন্ন লিপি প্রদান করা হতো।

ধর্মীয় জীবন :-

  • মেসোপটেমিয়া মিশরীয় সভ্যতার সাথে সিন্ধু সভ্যতার ধর্মীয় জীবনের অনেক মিল পাওয়া যায়।
  • হরপ্পা সভ্যতা ছিল মূলত মাতৃতান্ত্রিক সভ্যতা।
  • পুরুষ শক্তির প্রতীক ছিল পশুপতি শিব (ত্রিমুখ বিশিষ্ট ধ্যানরত একযোগী মুর্তী)।
  • মূর্তিটি পাঁচটি পশু দ্বারা পরিবৃত থাকতো বাঘ, মোষ, হাতি, গন্ডার, হরিণ।
  • নারী শক্তির প্রতীক হলো জঠরের মধ্যে থেকে গাছের উৎপত্তি।
  • সিন্ধু সভ্যতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পর্কিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ কবরস্থান হলো Cemetery R-37 এবং Cemetery H, যা মহেঞ্জোদারোতে আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলো থেকে সিন্ধু সভ্যতার জনগণের কবরের রীতি, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়।

১. Cemetery R-37

অবস্থান ও আবিষ্কার

  • মহেঞ্জোদারোর দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত।
  • ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক আর্নেস্ট ম্যাকেকে (Ernest Mackay) ১৯২৭-৩১ সালে এটি খনন করেন।

বৈশিষ্ট্য

  • এটি মূলত একটি প্রাথমিক সমাধিক্ষেত্র (Primary Burial Ground), যেখানে মৃতদেহ সমাধিস্থ করা হতো।
  • বেশিরভাগ কবর ছিল সরল গর্তের সমাধি (Simple Pit Burials), যা পূর্ব-পশ্চিম অভিমুখে ছিল।
  • অনেক ক্ষেত্রে মৃতদেহের পাশে মৃতের ব্যবহৃত জিনিসপত্র যেমন মাটির পাত্র, গহনা, অস্ত্র, খাদ্যদ্রব্য ইত্যাদি রাখা হতো।
  • কিছু কবর ইট বা কাঠের স্তম্ভ দিয়ে ঘেরা ছিল, যা সমাজের উচ্চস্তরের ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।
  • পুরুষ ও নারী উভয়ের কবর পাওয়া গেছে, এবং মৃতদেহ সাধারণত শোয়ানো অবস্থায় ছিল।

গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন

  • কিছু কঙ্কালে বাহুতে তামার বা ব্রোঞ্জের কুণ্ডলী পাওয়া গেছে, যা অলংকারের প্রচলন দেখায়।
  • কঙ্কালের দাঁত ও হাড় বিশ্লেষণ করে খাদ্যাভ্যাস এবং রোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা স্বাস্থ্যগত দিক নির্দেশ করে।
  • কিছু ক্ষেত্রে শিশুদের কবর পাওয়া গেছে, যেখানে মৃতদেহের পাশে ছোট ছোট পাত্র রাখা ছিল।

২. Cemetery H

অবস্থান ও আবিষ্কার

  • Cemetery R-37 এর কাছেই পাওয়া গেছে, তবে এটি সিন্ধু সভ্যতার পরবর্তী পর্যায়ের (Late Harappan Phase, ১৯০০ BCE পরবর্তী) অন্তর্ভুক্ত।
  • এটিও আর্নেস্ট ম্যাকেকে খনন করেন।

বৈশিষ্ট্য

  • এখানে অধিকাংশ কবর অস্থি সমাধি (Secondary Burial) বা অগ্নিসংস্কার পদ্ধতিতে করা হয়েছিল।
  • মৃতদেহ পোড়ানোর পর ভস্ম মাটির পাত্রে (urn burial) রেখে সমাধিস্থ করা হতো।
  • এটি Cemetery R-37 এর চেয়ে উন্নততর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পদ্ধতির প্রমাণ দেয়, যা পরিবর্তিত ধর্মীয় রীতির ইঙ্গিত বহন করে।
  • কিছু কবর বৃহত্তর ও সুসজ্জিত ছিল, যা সামাজিক বিভাজনের ইঙ্গিত দেয়।
  • সিন্ধু সভ্যতার জনগণের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এবং বিভিন্ন উপাদানের বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায় যে, তারা প্রধানত কৃষি, প্রাণিজ খাদ্য এবং মাছ আহরণের ওপর নির্ভরশীল ছিল। খাদ্যাভ্যাস ছিল বৈচিত্র্যময় এবং এতে শস্য, ফল, সবজি, মাছ, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল।

১. কৃষিভিত্তিক খাদ্য

  • সিন্ধু সভ্যতার জনগণ উন্নত কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। খননে পাওয়া বিভিন্ন ধান্যগোলা (granary) ও শস্য সংরক্ষণাগার থেকে জানা যায়, তারা শস্য উৎপাদন ও সংরক্ষণে দক্ষ ছিল।

মূল শস্য ও ফসল

  • সিন্ধু সভ্যতায় চাষ হওয়া প্রধান শস্য ও ফসলগুলোর তালিকা:
  • গম (Wheat)
  • বার্লি (Barley)
  • ডাল (Lentils & Pulses) – যেমন মসুর, মুগ, অড়হর
  • সরিষা (Mustard) ও তিল (Sesame) – তেল উৎপাদনের জন্য
  • ধান (Rice) – লোথাল ও রঙ্গপুর এলাকায় পাওয়া গেছে
  • বাজরা (Millets) – শুষ্ক অঞ্চলে চাষ করা হতো
  • শাকসবজি – শসা, মটর, শালগম, মুলো ইত্যাদি
  • ফলমূল – খেজুর, আম, নারকেল, তরমুজ

২. উদ্ভিজ্জ খাদ্য ও ফলমূল

  • তারা বিভিন্ন সবজি ও ফল খেত, যা প্রত্নতাত্ত্বিক খনন থেকে জানা গেছে।

মূল ফল

  1. খেজুর (Dates) – সবচেয়ে প্রচলিত ফল, সিন্ধু অঞ্চলে ব্যাপকভাবে পাওয়া যেত।
  2. আম (Mango) – কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে আমের গুটি পাওয়া গেছে।
  3. নারকেল (Coconut) – উপকূলবর্তী অঞ্চলে পাওয়া গেছে।
  4. তরমুজ (Watermelon) – শুকনো ও উষ্ণ জলবায়ু অঞ্চলে চাষ করা হতো।
  5. বেরি জাতীয় ফল (Berries) – কিছু স্থানে বেরির অস্তিত্বের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
  6. ডুমুর (Fig) – শুষ্ক অঞ্চলে পাওয়া যেত।
  7. আঙুর (Grapes) – কিছু এলাকায় আঙুরের চাষের সম্ভাবনা ছিল।

৩. প্রাণিজ খাদ্য ও মাছ

  • সিন্ধু সভ্যতার মানুষ কেবল শস্য বা ফলমূলই নয়, প্রাণিজ খাদ্যের ওপরও নির্ভর করত।
  • মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য
  • গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষের মাংস খাওয়া হতো।
  • শুয়োর ও হরিণের মাংস খাওয়ারও কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে।
  • দুগ্ধজাত পণ্য, যেমন দুধ ও ঘি খাওয়া হতো বলে অনুমান করা হয়।

মৎস্য আহার

  • সিন্ধু নদ এবং উপকূলবর্তী অঞ্চলে বসবাসকারী জনগণ মাছ ধরায় দক্ষ ছিল।
  • মহেঞ্জোদারো ও লোথাল থেকে মাছের হাড় পাওয়া গেছে, যা প্রমাণ করে তারা মাছ খেত।
  • শুকনো ও সংরক্ষিত মাছ খাওয়ার প্রচলন ছিল বলে ধারণা করা হয়।

৪. পানীয় ও অন্যান্য খাদ্য

  • জলাশয় ও কুয়ার পানি ব্যবহার করত।
  • গম ও বার্লি থেকে তৈরি পানীয় খাওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

ব্যবসা বাণিজ্য :-

  • হরপ্পা সভ্যতার মানুষেরা যে ব্যবসা বাণিজ্য করতো তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মূলত মেসোপটেমিয়া, আফগানিস্তান, সুমের প্রভৃতি দেশের সাথে স্থল ও জলপথে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রমাণ মিলেছে। মিশরের সঙ্গে এখানকার অধিবাসীদের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
  • মূল রপ্তানি দ্রব্য ছিল তুলা ও সুতির বস্ত্র, হাতির দাঁতের জিনিসপত্র এবং আমদানি করা হতো বিভিন্ন ধাতু যেমন সোনা, রূপা, তামা, জেড পাথর শঙ্খ প্রভৃতি।

Note

  • মহেঞ্জোদারোতে বৃহৎ স্নানাগারের নিদর্শন পাওয়া গেছে। মূলত ধর্মীয় কারণে সর্বসাধারণের জন্য নির্মিত হয়েছিল এই স্নানাগার। এর বাইরের আয়তন ছিল 180×108 বর্গফুট এবং ভেতরের আয়তন ছিল 39×23×8 ঘনফুট।
  • রাজস্থানের গঙ্গা নগরে ঘর্ঘরা নদীর তীরে মহেঞ্জোদারোর পশ্চিম দিকে কালিবঙ্গান নামক স্থানে 40 ফুট উঁচু ঢিবির ওপর 169×135 বর্গফুট মাপের একটি বৃহৎ শস্যাগার এর সন্ধান পাওয়া গেছে।
  • এছাড়া হরপ্পাতে ছয়টি সারিবদ্ধ শস্যাগার দেখা গেছে। দুর্গের বাইরেও শস্যাগার তৈরি করা হতো।

হরপ্পার সিলমোহর:-

  • সিন্ধুর সীলমোহরগুলি সাধারণত স্লেট পাথর (নরম পাথর) দ্বারা নির্মিত হতো।
  • এই সভ্যতার অধিকাংশ সিলমোহরে পশুর ছবি খোদাই করা হত। তাতে অল্প কিছু লিপি খোদিত হত।
  • সিন্ধু সভ্যতার একাধিক সিলমোহরে একশৃঙ্গ বিশিষ্ট ঘোড়ার চিত্র প্রস্ফুটিত হয়েছে। তাছাড়া মহেঞ্জোদারো থেকে বিখ্যাত ষাঁড়ের চিত্রযুক্ত সীলমোহর প্রাপ্ত হয়।

সিন্ধু সভ্যতায় প্রাপ্ত কিছু উল্লেখযোগ্য স্থান

স্থান:আবিষ্কারের বছরআবিষ্কারক:অবস্থান:বৈশিষ্ট্য:
হরপ্পা1921 খ্রিস্টাব্দদয়ারাম সাহানীপাঞ্জাবের মন্টগোমারি জেলা, রাভি নদীর তীরেবৃহদায়তন শস্যাগার
মহেঞ্জোদাড়ো1922 খ্রিস্টাব্দরাখালদাস ব্যানার্জিসিন্ধুর লারকানা প্রদেশ, সিন্ধুনদের তীরেএকমাত্র কফিনবন্দি সমাধি পাওয়া যায়
কালিবঙ্গান1953 খ্রিষ্টাব্দ, মতান্তরে 1955অমলেন্দ ঘোষরাজস্থানের ঘর্ঘরা নদীর তীরেবৃহৎ স্নানাগার
লোথাল1953 খ্রিষ্টাব্দ, মতান্তরে 1954সিকারিপুরা রঙানাথা রাওগুজরাটে ভোগাবর নদীর তীরেউপরের স্তর থেকে ঘোড়ার অস্তিত্ব
ধোলাভিরা1991 খ্রিস্টাব্দআর. এস. বিস্ট এবং জে. পি. যোশীগুজরাটের কচ্ছের রণ এলাকায়ব্রোঞ্জের নৃত্যরতা নারীমূর্তি
কোটদিজি1953 খ্রিষ্টাব্দফজল আহমেদপাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশসিলমোহরে পশুপতি শিবের ছবি
চানহুদাড়ো1931 খ্রিস্টাব্দননীগোপাল মজুমদারপাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশসাতটি অগ্নিকুণ্ড

মহেঞ্জোদাড়ো (সিন্ধু)

  • এটি হলো সিন্ধু সভ্যতার সর্বাধিক বৃহৎ স্থান, যা 1922 খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কার করেন রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
  • সিন্ধুর ভাষা অনুযায়ী, মহেঞ্জোদাড়ো কথাটির অর্থ হলো মৃতের স্তুপ।
  • মহেঞ্জোদাড়ো শহরটির প্রধান গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে একটি বৃহৎ স্নানাগার ছিল যা 39 ফুট লম্বা 23 ফুট চওড়া এবং ৪ ফুট গভীর ছিল। স্নানাগারটির নিকটবর্তী একটি নগর দুর্গ ছিল, যার ইটের নির্মাণকার্য ছিল লক্ষণীয়। এর মেঝে নির্মিত হয়েছিল পোড়া ইটের দ্বারা।
  • এই শহরটির অন্যান্য অট্টালিকা সমূহের পাশাপাশি ছিল একটি আয়তাকার সভাঘর। তৎসহ ছিল আরো একটি আয়তাকার বৃহৎ অট্টালিকা, যা মূলত সেবা কার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো।
  • মহেঞ্জোদারো শহরটি থেকে প্রাপ্ত হয়েছে পশুপতির সীলমোহর। ব্রোঞ্জ ধাতুর তৈরি একটি বালিকার নৃত্যরত মূর্তি, তিনটি নলাকার সীলমোহর।

হরপ্পা (পাকিস্তানের পাঞ্জাব)

  • এটি হলো সিন্ধু সভ্যতার প্রথম আবিষ্কৃত শহর যা 1921 খ্রিস্টাব্দে আবিষ্কার করেন দয়ারাম সাহানি। সিন্ধু সভ্যতা মূলত হরপ্পা সভ্যতা নামে পরিচিতি লাভ করে, এই সভ্যতায় সর্বপ্রথম হরপ্পা স্থানটি আবিষ্কৃত হবার পর।
  • হরপ্পা শহরটি থেকে একটি বৃহৎ শস্যাগার প্রাপ্ত হয়েছে যা ছিল একটি নগরদীপের নিকটবর্তী।
  • হরপ্পা শহরটির অবস্থান লক্ষ্য করে কতিপয় ঐতিহাসিক মন্তব্য করেছেন যে, এটি ছিল শহরের প্রবেশদ্বার।
  • এই শহরটি থেকে প্রাপ্ত হয়েছে-একাধিক কুমারী দেবী (সীলমোহর), কাঠের পাত্রে গম ও যব, তামার কেটলি এবং আয়না, নগ্ন পুরুষ ও নারীর নৃত্যরত মূর্তি (পাথর)।

ধোলাভিরা (গুজরাট)

  • সিন্ধু সভ্যতার সর্বাধুনিক শহরটি হল ধোলাভিরা। ভারতবর্ষে সিন্ধুসভ্যতার সর্ববৃহৎ শহরের সংখ্যা একটি অথবা দুটি। যার মধ্যে ধোলাভিরা অন্যতম। তাছাড়া এই সভ্যতার অন্য শহরটি হল হরিয়ানার রাখিগারহি।
  • এই ধোলাভিরা অঞ্চলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো যে, এটি দুটি নয় তিনটি অংশে বিভক্ত। যার দুটি অংশ সুগঠিত হয়েছিল পাথরের আয়তাকার গঠন দ্বারা। যা ছিল সিন্ধু সভ্যতার পণ্য বিক্রয়ের ঘর।
  • ধোলাভিরা শহরটির মধ্যবর্তী অঞ্চলের নগর পরিকল্পনার নির্মাণ কার্যে মনে করা হয় ঋক বৈদিক যুগের আর্যরা সাহায্য করেছিল।

সিন্ধু সভ্যতার ধ্বংসের/ পতনের কারণ:-

ঐতিহাসিক প্রবক্তা-ধ্বংসের কারণ (সম্ভাব্য):-
গর্ডেন চাইল্ড, স্টুয়ার্ট পিগটবহিঃশত্রুর আক্রমণ
এইচ. টি.ল্যামব্রিকঅশান্ত নদী (বন্যা প্লাবানে সিন্ধু সভ্যতা ডুবে যায়
কে ইউ আর কেনেডিপ্রাকৃতিক বিপর্যয়
ওরেল স্টেন, এ এন ঘোষজলবায়ুগত পরিবর্তন
আর মার্টিমার হুইলারআর্যদের আগমন
রবার্ট রাইকেসভূমিকম্প
সুদ এবং আগরওয়ালনদী শুকিয়ে যায় (অঞ্চলটি মরুভূমি হয়ে যায়)

Facebook
Twitter
LinkedIn

Books You Must Have

Scholar Academy এর এই বইগুলি WBP, KP, SSC Group C ও D পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে সহায়ক

See All Printed Books