বৈদিক যুগ

  • আর্যদের ভারতে প্রবেশের আনুমানিক সময়: 2000-1500 খ্রিস্টপূর্ব।
  • বাসস্থান: সপ্তসিন্ধু (সরস্বতী, সিন্ধু ও সিন্ধুর পাঁচটি উপনদী)
  • আর্যদের উৎসস্থল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে আজও ম তভেদ দেখা যায়। ম্যাক্স মুলার-এর মতে, আর্যদের আদি বাসস্থান মধ্য-এশিয়া; বালগঙ্গাধর তিলকের মতে আর্যদের উৎপত্তি উত্তর মেরু অঞ্চলে। স্বামী বিবেকানন্দ ভারতবর্ষকেই আর্যজাতির আদি বাসভূমি বলে উল্লেখ
  • মধ্য-এশিয়ার এশিয়া মাইনরে (বর্তমান তুর্কি) প্রাপ্ত ‘বোঘাজকাই করেছেন। লেখ’-তে উল্লিখিত চারটি বৈদিক দেবতার (ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র, নসত্য) নাম আর্যদের আদি বাসস্থান হিসেবে মধ্য-এশিয়াকেই প্রমাণ করে।
  • বৈদিক যুগের প্রথম ভাগকে অর্থাৎ যে সময়কালে ঋগ্বেদ রচিত বৈয়েছিল সেই সময়কে বলা হয় ঋগ্‌বৈদিক যুগ; অন্যান্য বেদ ও বৈদিক সাহিত্যগুলির রচনাকালকে বলা হয় পরবর্তী বৈদিক যুগ।

ঋগ্‌বৈদিক যুগ (1500-1200 খ্রিস্টপূর্ব)

  • শাসন স্তর: সভা, সমিতি, গণ ও বিধাতা।
  • মহিলারা সভায় অংশগ্রহণ করতে পারতেন।
  • পরিবারকে কুল । বলা হত। পরিবারের প্রধানকে বলা হত কলপা। কয়েকটি কুল নিয়ে তৈরি হত একটি গ্রাম। গ্রামের প্রধানকে বলা হত গ্রামিনী। এইভাবে কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হত একটি বংশ বা বিশ। বিশের প্রধানকে বলা হত বিশপতি। কয়েকটি বিশ নিয়ে আবার তৈরি হত একটি জন বা রাজ্য।
  • রাজাকে পরামর্শ দিত পুরোহিত ও সেনানী।
  • সমাজ তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল পুরোহিত, যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ।
  • ঋবৈদিক যুগের শেষ পর্যায়ে শূদ্র শ্রেণির উদ্ভব হয়।
  • বর্ণভেদ প্রথার উল্লেখ পাওয়া যায়।
  • দাসত্ব প্রথা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।

বৈদিক যুগের সভা ও সমিতি

বৈদিক যুগে প্রশাসন ও শাসনব্যবস্থা মূলত দুইটি গুরুত্বপূর্ণ গণপরিষদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো— সভা ও সমিতি। এগুলো ছিল গণতান্ত্রিক প্রবণতার সূচনা, যেখানে সাধারণ মানুষও রাজনৈতিক বিষয়ে মতামত দিত।

১. সভা

সভা ছিল এক ধরনের এলিট বা অভিজাত শ্রেণির পরিষদ, যেখানে প্রধানত ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা অংশগ্রহণ করত।

সভার বৈশিষ্ট্য:

  • এটি ছিল একটি উপদেষ্টা পরিষদ, যা রাজাকে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করত।
  • সাধারণ জনগণ এতে সরাসরি অংশগ্রহণ করতে পারত না, শুধুমাত্র সমাজের উচ্চ শ্রেণির লোকেরা (ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়) সদস্য হতে পারত।
  • কখনো কখনো এটি বিচারালয়ের কাজও করত এবং গুরুতর অপরাধের বিচার করত।
  • রাজা এতে উপস্থিত থাকতেন, তবে অনেক সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ছিল শুধুমাত্র সভার সদস্যদের হাতে।

২. সমিতি

সমিতি ছিল অপেক্ষাকৃত বৃহৎ ও গণতান্ত্রিক পরিষদ, যেখানে সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণ ছিল বেশি।

সমিতির বৈশিষ্ট্য:

  • এটি ছিল একটি জনগণের পরিষদ, যেখানে সাধারণ মানুষও অংশগ্রহণ করতে পারত।
  • রাজা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত।
  • রাজনীতির পাশাপাশি ধর্মীয় এবং সামাজিক বিষয় নিয়েও এখানে আলোচনা হতো।
  • যুদ্ধ ও শান্তি সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণেও এর ভূমিকা ছিল।

বৈদিক যুগে নারীর অবস্থা

বৈদিক যুগে নারীরা সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের অবস্থান পরিবর্তিত হয়। বৈদিক যুগকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়—

  1. প্রারম্ভিক বৈদিক যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-১০০০) – নারীরা তুলনামূলক স্বাধীন ও সম্মানিত ছিলেন।
  2. পরবর্তী বৈদিক যুগ (খ্রিস্টপূর্ব ১০০০-৫০০) – নারীর অবস্থান ক্রমশ নিম্নগামী হতে থাকে।

প্রারম্ভিক বৈদিক যুগে নারীর অবস্থান

১. শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা:

  • নারীরা শিক্ষালাভের সুযোগ পেতেন এবং অনেক নারী ঋষি ও দার্শনিক ছিলেন।
  • কিছু বিশিষ্ট নারী ঋষি ছিলেন যেমন গার্গী, ম্যিত্রেই, লোপামুদ্রা ইত্যাদি।
  • তারা উপনয়ন (শিক্ষা গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা) সম্পন্ন করতে পারতেন এবং বেদ অধ্যয়ন করতেন।

২. পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা:

  • পরিবারে নারীদের সমান মর্যাদা ছিল।
  • বিবাহ ছিল সাধারণত স্বয়ম্বর প্রথা দ্বারা পরিচালিত, যেখানে নারী নিজের জীবনসঙ্গী বেছে নিতে পারতেন।
  • বিধবাদের পুনর্বিবাহের অধিকার ছিল এবং বহুবিবাহের প্রচলন কম ছিল।

৩. অর্থনৈতিক স্বাধীনতা:

  • নারীরা সম্পত্তির অধিকার ভোগ করতেন এবং কিছু ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারও পেতেন।
  • তারা গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি বুনন, দুগ্ধজাত পণ্য প্রস্তুতি ও পশুপালন করতেন।

৪. ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভূমিকা:

  • নারীরা যজ্ঞ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে পারতেন।
  • কিছু ক্ষেত্রে নারীরা সমিতি ও সভার আলোচনায় অংশগ্রহণ করতেন।

পরবর্তী বৈদিক যুগে নারীর অবস্থান

পরবর্তী বৈদিক যুগে সমাজে পুরুষতান্ত্রিক ধারা আরও শক্তিশালী হয়, যার ফলে নারীদের অবস্থান দুর্বল হতে থাকে।

১. শিক্ষা ও বেদাধ্যয়ন:

  • নারীদের উপনয়ন ও বেদ অধ্যয়নের অধিকার কমে আসে।
  • শিক্ষার সুযোগ সীমিত হয়ে যায় এবং তারা গৃহস্থালি কাজেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকেন।

২. বিবাহ ও পরিবার:

  • স্বয়ম্বর প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং কন্যাদান প্রথা চালু হয়, যেখানে বাবা-মা পাত্র নির্বাচন করতেন।
  • বহুবিবাহের প্রচলন বৃদ্ধি পায় এবং বিধবা বিবাহ প্রায় নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
  • দেহজ সন্তান (নিয়োগ প্রথা) নামক এক সামাজিক প্রথার উদ্ভব ঘটে, যেখানে সন্তান জন্মদানের জন্য বিধবাদের অন্য কারও সঙ্গে মিলনের অনুমতি দেওয়া হতো।

৩. সম্পত্তির অধিকার:

  • নারীদের সম্পত্তির অধিকার ক্রমশ কমে যায়।
  • তাদেরকে পুরুষের উপর নির্ভরশীল করে তোলা হয় এবং উত্তরাধিকার আইন নারীদের বিপক্ষে দাঁড়ায়।

৪. ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থান:

  • নারীরা যজ্ঞ বা ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপে স্বতন্ত্র ভূমিকা পালন করতে পারতেন না।
  • সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা কমে যায়।

পরবর্তী বৈদিক যুগ (1100-500 খ্রিস্টপূর্ব)

  • আর্যাবর্ত, মধ্যদেশ ও দক্ষিণাপথ-ভারত ভূখণ্ডের তিনটি শ্রেণিবিভাগের উল্লেখ পাওয়া যায়।
  • রাজা আরও শক্তিশালী হন। ‘জনপদ’-এর উদ্ভব হয়।
  • লোহার ব্যবহার (মূলত কৃষিকার্যে) শুরু হয়।
  • পুরুষসূক্ত মতবাদের উদ্ভব হয়।
  • চতুরাশ্রমের (ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ, সন্ন্যাস) উদ্ভব হয়। সন্ন্যাস-এর অপর নাম ‘যতি আশ্রম’।
  • গোত্র প্রথার উদ্ভব হয়। অনুলোম ও প্রতিলোম বিবাহের সূচনা হয়।
  • রাজসূয় ও অশ্বমেধ যজ্ঞের সূচনা হয়।
  • নারীর মর্যাদার অবনতি হয়।
  • মুদ্রা: শতমনা ও কৃষ্ণাল (নিষ্ক পরিমাপের এককে পরিণত হয়)।
  • চাষের সময়: বছরে দু-বার রবি ও খারিফ শস্য।

দশ রাজার যুদ্ধ

  • কথিত আছে, রাভি নদীর তীরে এই যুদ্ধ হয়। রাজা সুদাস ও ভরত একত্রে দশটি উপজাতির (পাঁচটি আর্য ও পাঁচটি অনার্য) রাজা পুরুষসূক্তকে পরাজিত ও হত্যা করেন। ভরতের পুরোহিত বশিষ্ঠ ও জোটের পুরোহিত বিশ্বামিত্রের মধ্যে মতবিরোধের কারণে এই যুদ্ধ হয়।

পুরুষসূক্ত মতবাদ

  • ঋগবেদের দশম মন্ডলে এই মতবাদের উল্লেখ পাওয়া যায়। এই মতবাদ অনুযায়ী পুরুষসূক্তের মুখ থেকে ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে ক্ষত্রিয়, ঊর থেকে বৈশ্য এবং পা থেকে শূদ্র জাতির উদ্ভব হয়েছে।

বৈদিক পরিভাষা

  • সমুদ্র: জলাধার (সাগর নয়)।
  • হিম্বত: তুষারশৃঙ্গ।
  • স্পর্শ: গুপ্তচর।
  • আয়স: ধাতু (তামা ও ব্রোঞ্জ)।
  • কুলপা: পরিবারের প্রধান।
  • গ্রামিনী: গ্রামের প্রধান।
  • গত্যুতি: দূরত্বের একক।
  • নিয়োগ: এক প্রকার বিধবাবিবাহ।
  • সংগ্রাহিকা: হিসাবরক্ষক।
  • অক্ষবপঃ খেলায় সেরা।
  • ভাগদাগা: কর সংগ্রাহক।
  • ধাওয়া: মরুভূমি।
  • গোপজনস্য: রাজা।
  • গভিষ্ঠী: গোরুর জন্য যুদ্ধ।
  • জন: রাজ্য, সাধারণ মানুষ।
  • কুল: পরিবার।
  • ভিষক বা বিশাখা: চিকিৎসক।
  • গোধূলি: সময়ের একক।
  • কার্মার: কামার।
  • পলাগল: বার্তা বাহক।
  • জীবগ্রিভ: পুলিশ অফিসার।
  • মহিষী: প্রধান রানি।

Facebook
Twitter
LinkedIn

Books You Must Have

Scholar Academy এর এই বইগুলি WBP, KP, SSC Group C ও D পরীক্ষার জন্য বিশেষভাবে সহায়ক

See All Printed Books